রাসেল মোল্লা, কলাপাড়াঃ পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১০ মাস বয়সী শিশু রাইয়ান হত্যা মামলার প্রধান আসামি তার খালু আল-আমীন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। চার দিনের পুলিশি রিমান্ড শেষে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি শিশুটিকে অপহরণ, হত্যা ও মরদেহ গুমের চেষ্টার বিবরণ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগে সারা রাত জেগে ইয়াবা সেবন করেছিলেন আল-আমীন। পরে ফজরের আজানের সময় তিনি শিশুটির মা রুমানার বাড়িতে যান। রুমানা তখন ঘরের মেঝেতে পিঁড়ি লেপার কাজ করছিলেন। শিশুটি তার বাবার পাশে বিছানায় ঘুমিয়ে ছিল। সেখান থেকে শিশুটিকে নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে চলে যান আল-আমীন।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাতে জানা যায়, শিশুটিকে নিজের বাড়ির সামনে গ্রামের হেলালের একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে যান তিনি। সেখানে শিশুটিকে নিথর অবস্থায় দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। পরে একটি কালো কাপড়ের ব্যাগে শিশুটির মরদেহ ভরে প্রথমে পরিত্যক্ত ঘরের টিনের চালায় রাখেন। এরপর পুকুরে নেমে নিজেকে ভিজিয়ে নেন, যাতে তাঁকে দেখে কেউ মাছ ধরে ফেরার কথা মনে করেন।
পরে মরদেহভর্তি ব্যাগটি নিজের বাড়ির পেছনের একটি খালে ফেলে দেন আল-আমীন। ব্যাগটি ডুবে না যাওয়ায় আবার খালে নেমে কচুরিপানার মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। এরপর বাড়িতে ফিরে স্বাভাবিক আচরণ করেন। পরে অন্যদের সঙ্গে তিনিও শিশুটিকে খোঁজার কাজে অংশ নেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।
পারিবারিক বিরোধের কথা জবানবন্দিতে
জবানবন্দিতে আল-আমীন দাবি করেন, তাঁর স্ত্রী ফিরোজা বেগম পাঁচ বছর ধরে বিদেশে থাকেন। এ নিয়ে পারিবারিক বিরোধের সমাধান চেয়ে তিনি একাধিক ব্যক্তির কাছে গিয়েছিলেন। সর্বশেষ শ্যালিকা রুমানার কাছে গেলে তিনি অপমানিত হন এবং রুমানা তাঁকে জুতা দিয়ে আঘাত করেন বলে দাবি করেন আল-আমীন।
এই বিরোধ থেকে রুমানার ওপর ক্ষোভ তৈরি হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। এর জেরেই শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে তাকে হত্যা করেন বলে স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছেন।
কলাপাড়া থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. ফোরকান মিয়া জানান, ১৮ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে প্রধান আসামি আল-আমীনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। চার দিন পর তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। ২১ অক্টোবর তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
নিরাপত্তাহীনতায় শিশুটির পরিবার
শিশু রাইয়ান হত্যার ঘটনায় তার মা রুমানা বেগম যথাযথ বিচার দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, শিশুটিকে হত্যা করে কাপড়ের ব্যাগে ভরে খালের কচুরিপানার নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় তাঁর পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
রুমানার অভিযোগ, আল-আমীনের সহযোগী ও তাঁর কথিত পৃষ্ঠপোষকদের হুমকির কারণে তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাঁর অপর দুই সন্তান—১৪ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রী তানহা ও আট বছর বয়সী তাহিরা এবং তাঁর স্বামী রাসেল খানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
রুমানা জানান, ১৫ অক্টোবর রাতে পুলিশ আল-আমীনকে আটক করার পর এক ব্যক্তি কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে তাঁদের বাড়ির সামনে গিয়ে গালাগাল করেন এবং আল-আমীনকে ছাড়িয়ে না আনলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেন বলে অভিযোগ। ওই ব্যক্তি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য বলে দাবি করেন রুমানা। তাঁর ভাষ্য, এরপর থেকে তাঁরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আল-আমীনের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, মাদক কারবার ও চুরির অভিযোগও করেছেন রুমানা। তাঁর দাবি, গুটাবাছা গ্রামের তিনটি নলকূপসহ বিভিন্ন স্থানে পানির পাম্প চুরির সঙ্গে আল-আমীন জড়িত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
রুমানার ভাষ্য, তাঁর বোন ফিরোজার সঙ্গে আল-আমীনের বৈবাহিক বিরোধ থেকেই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
৫৩ ঘণ্টা পর খাল থেকে মরদেহ উদ্ধার
এর আগে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ৫৩ ঘণ্টা পর গত ১৭ অক্টোবর বাড়ির পাশের একটি খাল থেকে শিশু রাইয়ানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেদিন বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় লোকজন খাল থেকে দুর্গন্ধ পান। পরে কচুরিপানার মধ্যে একটি ব্যাগ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন তাঁরা। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যাগ থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় গুটাবাছা গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, “আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুত মূল আসামিকে আটক করি। নিখোঁজের ৫৩ ঘণ্টা পর শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এখন পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
রাইয়ানের পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়ে ওসি বলেন, ওই পরিবারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক থানায় জানাতে বলা হয়েছে।




