আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতির মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের এই দিনে রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল ঘটে; উন্মোচিত হয় দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের।
স্বাধীনতার পর ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রাষ্ট্রীয় অনিশ্চয়তার এক গভীর সংকটে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা ও সেনাবাহিনীর জনপ্রিয় নেতা জিয়াউর রহমানকে ঘিরে সেদিন সেনাসদস্যদের বিদ্রোহের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐক্য এবং জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয়ই ছিল ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মূল প্রেরণা। এ ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে উত্থানের পথ সুগম হয়।
এ ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সূচিত হয় নতুন অধ্যায়, আর জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির বীর যোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার পথে ৭ নভেম্বর তার জীবনের এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতির স্মারক এই দিনটি দেশবাসীর কাছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পরিচিত।
জিয়াউর রহমানের সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় তিনি বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা দেশের মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়ে তুলতে সহায়ক হয়। পরে তিনি প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক এবং জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বীর-উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তার সামরিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা আরো বিস্তৃত হয়। ১৯৭২ সালে তিনি সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে মেজর জেনারেল হন। ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা, পেশাগত দক্ষতা ও সেনাসদস্যদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। স্বাধীনতার পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসে। খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। কিন্তু পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে নেতৃত্ব, পদোন্নতি ও কমান্ডকাঠামো নিয়ে বিরোধ বাড়তে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটে। ওইসময় জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়। একইদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা নিহত হন।
এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেনাসদস্যদের একটি অংশ বিদ্রোহে অংশ নেয়। জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে সৃষ্ট অসন্তোষ, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সেদিনের ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করে। সৈনিকদের বিদ্রোহের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের কারণে দিনটি ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
বর্তমান স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ৭ নভেম্বরকে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন। তার স্মৃতিচারণে উঠে আসে, সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া এবং নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ পরিস্থিতিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। তার মতে, জিয়াউর রহমানের মুক্তির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের বক্তব্যেও উঠে আসে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসারিতে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে সেনাবাহিনীসহ দেশের মানুষের কাছে জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সেই জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হয়। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান হন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। তার শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিভিন্ন কর্মসূচি গুরুত্ব পায়।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তার প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণা দেশের রাজনৈতিক পরিচয় ও রাষ্ট্রচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেয়। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভূখণ্ডের বৈচিত্র্যকে ধারণ করে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার দর্শন হিসেবে এ ধারণা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষির ওপর গুরুত্বারোপ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ তার শাসনামলে বিশেষ গুরুত্ব পায়। ‘খাল খনন কর্মসূচি’ গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত। গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা তার রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
৭ নভেম্বর তাই শুধু স্মৃতিচারণের দিন নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব থেকে সামরিক নেতৃত্ব, বন্দিদশা থেকে মুক্তি, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ এবং দেশ গঠনের উদ্যোগ- জিয়াউর রহমানের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় এই দিনের সঙ্গে যুক্ত। সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছিল, তার প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় বহমান থেকেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধে অবদান এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার উত্থানকে কেন্দ্র করেই ৭ নভেম্বর আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন।




