রাসেল মোল্লাঃ পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ২৬ দিনের ব্যবধানে আবারও একটি বিশালাকৃতির মৃত বেলিন তিমি ভেসে এসেছে। সোমবার (২৯ জুন) দুপুর ১২টার দিকে কুয়াকাটার গঙ্গামতি এলাকার কাউয়ারচর সংলগ্ন বসুধা আইল্যান্ডের সৈকতে প্রায় ৫৬ ফুট দৈর্ঘ্যের তিমিটি শনাক্ত করেন উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা)-এর সদস্যরা। খবর ছড়িয়ে পড়লে বিরল এ সামুদ্রিক প্রাণীটি দেখতে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের ভিড় জমে।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা)-এর আহ্বায়ক কেএম বাচ্চু জানান, সকালে সৈকতে দায়িত্ব পালনরত স্থানীয় ট্যুর গাইড তরিকুল ইসলাম প্রথম মৃত তিমিটি দেখতে পান এবং বিষয়টি তাদের অবহিত করেন। পরে বন বিভাগকে খবর দেওয়া হয়। তিনি জানান, তিমিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬ ফুট এবং প্রস্থ ১৬ ফুট। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় এক সপ্তাহ আগে তিমিটির মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা)-এর যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার তিমি, ডলফিন ও সামুদ্রিক কচ্ছপের মৃতদেহ উপকূলে ভেসে আসছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
উপকূল ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, এটি অত্যন্ত বড় আকৃতির একটি বেলিন তিমি। এর আগে ২০১৮ ও ২০২২ সালে একটি করে এবং চলতি বছরের ৩ জুন কুয়াকাটা সৈকতে আরও একটি মৃত তিমি ভেসে এসেছিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার এ ধরনের ঘটনা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত। তিনি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার দাবি জানান।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স ও মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক রাজীব সরকার বলেন, বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এটি একটি বেলিন তিমি। এ ধরনের তিমি সমুদ্রের প্ল্যাঙ্কটন ও ক্ষুদ্র অণুজীব ছেঁকে খাদ্য গ্রহণ করে। সমুদ্রের পরিবেশগত পরিবর্তন, খাদ্য সংকট, অসুস্থতা, জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ কিংবা সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে এ ধরনের বড় সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী উপকূলে ভেসে আসতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, তিমিটির নমুনা সংগ্রহ করে প্রজাতি শনাক্ত এবং কঙ্কাল সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ইয়াসীন সাদেক জানান, মৃত তিমিটি পচনশীল অবস্থায় থাকায় বন বিভাগ ও কুয়াকাটা পৌরসভার সহযোগিতায় সেটিকে মাটি চাপা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে দুর্গন্ধের কারণে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি না হয়।
বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান
জানান, তিমিটির প্রজাতি শনাক্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া তিমিটির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৩ জুন কুয়াকাটা সৈকতে একটি মৃত তিমি ভেসে এসেছিল। মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে একই উপকূলে আবারও একটি বিশালাকৃতির বেলিন তিমির মৃতদেহ ভেসে আসায় সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।




