ঝড়ে গেলো একটি বছর, টাকার অভাবে বোর্ড পরীক্ষায় বসতে পারেনি কলাপাড়ার সোহান

রাসেল মোল্লা, কলাপাড়া( পটুয়াখালী) প্রতিনিধি।। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের মরিচবুনিয়া গ্রামের হতদিরদ্র পিতা আনোয়ার হাওলাদারের ছেলে সোহান। গত দুই মাস যাবৎ ভোকেশনাল (৯ম শ্রেণীর) বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহনের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় পরীক্ষার উদ্দেশ্যে অন্য সহপাঠীদের সাথে উপজেলার সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে অংশ নিতে আসেন এই শিক্ষার্থী। পরীক্ষা কেন্দ্রে এসে জানতে পারেন টাকা নিয়েও প্রবেশ পত্রসহ প্রয়োজনীয় কোন কাগজই সম্পাদন করেননি শিক্ষক। ফলে পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ অপেক্ষার পর অংশ নিতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। শিক্ষক হাসানের চাহিদামত দশ হাজার টাকা পরিশোধ না করায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ছাড়াই ভেজা চোখে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাকে। এমনই অভিযোগ করেন শিক্ষার্থী সোহানের পরিবারের সদস্যরা।

এদিকে, বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারায় একটি বছর ঝড়ে গেলো তার জীবন থেকে। দরিদ্র পিতা আবার তাকে লেখাপড়ার সুযোগ দিবে কিনা সেটাও প্রশ্ন শিক্ষার্থী সোহানের।

শিক্ষার্থী সোহানের অভিযোগ, গত তিনমাস আগে পাচজুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল শাখায় ভর্তি হয়ে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে সাড়ে তিন হাজার টাকা তুলে দিয়েছেন নাম সর্বোস্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কারি শিক্ষক হাসানের হাতে। নিয়মানুযায়ী ৬ নভেম্বরের সকালে অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হন তিনি। কিন্তু পুলিশি পাহারায় পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রবেশ পত্র জমা দিতে পারেনি সোহান। ঠিক তখনও মুঠোফোনে স্বল্প সময়ের মধ্যে অনুমতি পত্র নিয়ে হাজির হওয়ার কথা বলছিলেন অভিযুক্ত শিক্ষক হাসান।
কিন্তু পরীক্ষা শুরুর ঘন্টা পেরিয়ে গেলে ব্যবহৃত মোবাইল বন্ধ রাখেন ভোকেশনাল নামধারী ওই শিক্ষক। ফলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পেরে মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়ে এই কিশোর শিক্ষার্থী। যা হৃদয় ছুয়ে যায় স্থানীয়সহ উপস্থিত অভিভাবকদের। আর সোহানকে দেখে শান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না উপস্থিত পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও।

সোহানের সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে আসা তার চাচা মো. ওমর ফারুক জানান, রেজিষ্ট্রেশন ফি সহ মোট সাড়ে তিন হাজার টাকা দেওয়ার পরও অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা চেয়ে ছিলেন নাম ধারী ভোকেশনাল শিক্ষক হাসান। আর তা না দেওয়ার ফলেই আমার ভাতিজার ১ টি বছর শেষ করে দিয়েছেন শিক্ষক নামের ওই কসাই।

তবে এর পরেই সংবাদকর্মীদের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে দাপুটে শিক্ষক হাসানের দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ধানখালী পাচজুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার তথ্য। যিনি দেড়যুগ যাবৎ ওই প্রতিষ্ঠানের সকল রেজুলেশন বইসহ শিক্ষার্থী পরিচালনা আইডি পাসওয়ার্ড পর্যন্ত নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। যা শুনে নড়েচড়ে বসেন মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের উপজেলা কর্মকর্তারা।

আরও আশ্চর্যের বিষয় ওই প্রতিষ্ঠানের ভোকেশনাল শাখায় দীর্ঘ বছরে ঠিক কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন তাও জানেন না বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

আর প্রভাবশালী এই ব্যক্তি হাসান আমতলী উপজেলার টেপুরা আহম্মাদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক পদেও কর্মরত। সেখানেও নিয়মিত পাঠদানে অংশ নেন তিনি। তবুও অতিরিক্ত অর্থ আয়ের জন্য অবৈধভাবে পাচজুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল শাখার সকল কার্যক্রম নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন হাসান।

ধানখালী পাচজুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কুতুবউদ্দিন বলেন, “আমি এই বিদ্যালয়ে যোগদান করেছি প্রায় এক বছর। আমার আগেও আরও চারজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু তারা কেউই ভোকেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি। হাসানের একক আধিপত্য বিস্তারে কেউ মুখ খোলার সাহসও পায়নি। কিন্তু আমি বিষয়টি জানতে চাওয়ায় দুদিন আগে আমার বিদ্যালয়ে এসে হুমকি দিয়ে গেছেন। ওই সময়ে ইউএনও স্যারসহ সংশ্লিষ্ট উপরস্থ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে রেজুলেশন বই চাইলেও মাদরাসা শিক্ষক হাসান তা ফেরত দেননি। উল্টো আমাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।”

একই বিদ্যালয়ে কর্মরত অভিযুক্ত ব্যক্তি মো. হাসানের বোন সহকারী শিক্ষক ইমরানা বেগম জানান, ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা তুলশি রানী তার ভাই হাসানের মাধ্যমে ভোকেশনাল সম্পর্কিত কাগজ পত্র সম্পাদন করেন। এসময় ভোকেশনালের আইডি পাসওয়ার্ড তার ভাই হাসানের কাছেই ছিল। এরপর ১৭ বছর কেটে গেলেও আর রেজুলেশন বইসহ কোন কিছুই তিনি ফেরত দেন নি। এটা প্রভাব খাটিয়ে এবং অনৈতিক ভাবে তার ভাই অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকেও পরিচালনা করছেন বলে তিনি স্বীকার করেন।

তবে এ বিষয়ে আমতলী উপজেলার টেপুরা আহম্মেদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক হাসান জানান, একটা পরীক্ষা গেছে তাতে সমস্যা নাই, আগামী বছর দেবে। তবে কোন ক্ষমতাবলে ভোকেশনাল শাখার সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই প্রতিষ্ঠান আমার টাকায় করেছি, তাই আমি মানুষ দিয়ে চালাই। শিক্ষার্থীর কাছে টাকা দাবীর বিষয়ে জানতে চাইলে বোর্ডে টাকা দিতে হবে বলে জানান। তবে, এসকল বিষয়ে তিনি সংবাদকর্মীদের কাছে সহানুভ‚তি কামনা করেন।

কলাপাড়া উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. মনিরুজ্জামান জানান, পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলাম, সেই সময়ে বিষয়টি জেনেছি। কিন্তু এর আগে ইউএনও স্যার নিজেও হাসানের কাছে ভোকেশনালের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্যারকে গুরুত্ব দেননি। এখন এক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি এটা খুবই দুঃখ জনক। বিষয়টি আমরা উপরস্থ কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। ইউএনও স্যারও বিষয়টি অবগত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *