কলাপাড়ায় মঙ্গলসুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ

রাসেল মোল্লা, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মঙ্গলসুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমুস সাকিব খান কনার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, স্বেচ্ছাচারিতা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে অসদাচরণসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে গত ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে কলাপাড়া উপজেলা প্রেস ক্লাবে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন একদল অভিভাবক।

লিখিত অভিযোগে প্রধান শিক্ষক নাজমুস সাকিব খান কনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বুশরাত খান ইতির বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তিন লাখ টাকার বরাদ্দের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে Education in Emergency (EiE) বা অস্থায়ী গৃহ নির্মাণ খাতে বিদ্যালয়ের অনুকূলে বরাদ্দ পাওয়া তিন লাখ টাকা যথাযথভাবে ব্যয় করা হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। বরাদ্দের অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা। এ ছাড়া আর্থিক অনিয়ম আড়াল করতে নিজেদের সুবিধামতো বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা বরাদ্দের অর্থ ছাড়, ব্যয়ের হিসাব, ভাউচার, রেজিস্টার ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের স্লিপ ফান্ডের অর্থ ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজের জন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়েছে।

বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে কর্মরত দেখিয়ে বাসায় ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ-সংক্রান্ত বিষয় প্রকাশ্যে আসার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ছবি ফেসবুকে প্রচার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

এ ছাড়া প্রধান শিক্ষকের নিয়মিত দেরিতে বিদ্যালয়ে আসা এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিভাবকদের দাবি, সরকারি বিধিবিধানের বাইরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মূল্যায়ন বা পরীক্ষার ফি এবং ভর্তি ফি বাবদ অর্থ আদায় করা হয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

প্রাইভেট পড়ানো ও পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে পক্ষপাতের অভিযোগ

প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রাইভেট পড়ানোকে কেন্দ্র করে অভিভাবকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, অশালীন ভাষা ব্যবহার এবং চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। প্রাইভেট পড়ানোর শর্তে শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর অভিযোগও তুলেছেন অভিভাবকেরা।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রান্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিজের কাছে রেখে তা ফাঁসের মাধ্যমে তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. জারিফের অভিভাবকের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টিও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অভিভাবক সন্তানকে প্রধান শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়ানোর সিদ্ধান্ত জানালে তাঁকে গালাগাল করা হয় এবং বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়নে চতুর্থ শ্রেণির ইংরেজি বিষয়ের উত্তরপত্র মূল্যায়নেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন অভিভাবকেরা। তাঁদের দাবি, প্রধান শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীদের বেশি নম্বর দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে তাঁর বাক্‌বিতণ্ডা হয় এবং অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।

শিক্ষক-অভিভাবকদের সঙ্গে অসদাচরণ ও হুমকির অভিযোগ

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলেছেন অভিভাবকেরা। তাঁদের দাবি, যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে তুলনামূলক কম পারদর্শী শিক্ষার্থীদের তালিকাভুক্ত করে উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছিল।

বিদ্যালয়ে পুলিশ আনার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্কের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে বলা হয়, গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে শিক্ষকদের মধ্যে মারামারির অভিযোগ তুলে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে পুলিশ নিয়ে আসেন। অভিযোগকারীদের দাবি, পুলিশ অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করে। এ ঘটনায় ছোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে এবং বিদ্যালয়ে তাদের উপস্থিতি কমে গেছে বলেও দাবি করেছেন অভিভাবকেরা।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, এসব কর্মকাণ্ডে সহকারী শিক্ষক বুশরাত খান ইতি সহযোগিতা করে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক ও ওই সহকারী শিক্ষকের আচরণে শিক্ষক ও অভিভাবকেরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি

অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে বিদ্যালয়ের আর্থিক বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব, ভাউচার, রেজিস্টারসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন অভিযোগকারীরা।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক নাজমুস সাকিব খান কনা ও সহকারী শিক্ষক বুশরাত খান ইতির বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *