অস্তিত্ব সংকটে এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর, হারিয়ে যাওয়ার শঙ্ক

রাসেল মোল্লা, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)।। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী, পানি ও পরিবেশের ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘরটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। পর্যাপ্ত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রচারণা ও দর্শনার্থীর অভাবে একসময় দেশি-বিদেশি পর্যটক ও গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রটি এখন অনেকটাই নির্জন। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৫ জন দর্শনার্থী আসছেন।

উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারা বাজারসংলগ্ন এলাকায় ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ১৫ শতাংশ জমির ওপর জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের অর্থায়নে ‘আভাস’ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় সংগঠন উপকূলীয় জনকল্যাণ সংঘের সহযোগিতায় এর যাত্রা শুরু হয়।

জাদুঘরটিতে বর্তমানে দেশ-বিদেশের ৮৭টি নদীর পানির নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের পাঁচটি, বিদেশের ১২টি এবং আন্তসীমান্তবর্তী প্রায় ৭০টি নদীর পানির নমুনা রয়েছে। নদী ও পানিসম্পদের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি এখানে রয়েছে পরিবেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও নদীকেন্দ্রিক বিভিন্ন বই ও তথ্যসমৃদ্ধ উপকরণ।

জাদুঘরের কিউরেটর লিপি মিত্র জানান, আগে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দর্শনার্থী এলেও এখন গড়ে ৩ থেকে ৫ জন আসেন। সীমিত আয় ও পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, প্রদর্শনী উপকরণ সংরক্ষণ ও প্রচারণা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি পর্যায় থেকেও কোনো আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।

জাদুঘরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আয় হয়েছে ২৬ হাজার ৩৩০ টাকা, ব্যয় ৩৭ হাজার ৬২২ টাকা। এতে ঘাটতি ছিল ১১ হাজার ২৯২ টাকা। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আয় ১৩ হাজার ৪০ টাকা এবং ব্যয় ৩৩ হাজার ৩৮৮ টাকা। দুই সময়ের হিসাবে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৬৪০ টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকে। পাশাপাশি ক্যাপ, টি-শার্ট ও মগ বিক্রি করে কিছু অর্থ আয় হয়। তবে এসব অর্থ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জাদুঘরের উন্নয়ন ও কার্যক্রম সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে না।
জাদুঘরের সাংগঠনিক সম্পাদক উত্তম সরকার বলেন, এটি শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং উপকূলীয় মানুষের ঐতিহ্য, নদী ও পানিসম্পদ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। নতুন প্রজন্মকে সচেতন করতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা জরুরি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সফর, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম, পর্যটন মানচিত্রে অন্তর্ভুক্তি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে জাদুঘরটিকে আবারও প্রাণবন্ত করা সম্ভব।

নদী ও পানিসম্পদ রক্ষার বার্তা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এ জাদুঘরই এখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়ছে। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘরটি একসময় হারিয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *