মহাবিশ্বের সবকিছুই আল্লাহর প্রশংসায় তাসবিহ পাঠ করে

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, সাত আসমান ও জমিন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁর তাসবীহ পাঠ করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রসংশায় তাসবিহ পাঠ করে না; কিন্তু তাদের তাসবিহ তোমরা বুঝ না। নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ। (সুরা ইসরা: ৪৪)

অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের সবকিছুই আল্লাহর প্রশংসায় তাসবিহ পাঠ করছে, কিন্তু মানুষ সব সৃষ্টির তাসবিহ বুঝতে বা অনুধাবন করতে পারে না। আল্লাহ তাআলার যেসব সৃষ্টির প্রাণ আছে, যারা নড়াচড়া করতে পারে, ডাকতে বা আওয়াজ করতে পারে, তারা যেমন আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে, তেমনি বিশ্বজগতের জড়বস্তুগুলো যেমন আসমান, জমিন, গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, পাথর, পানি ইত্যাদিও তাঁর তাসবিহ পাঠ করে।

জড়বস্তুর মধ্যেও যে খোদাভীতি ও অনুভূতির অস্তিত্ব রয়েছে, তার একটি প্রমাণ হলো তুর পাহাড়ের ঘটনা। আল্লাহ তাআলা হজরত মুসাকে (আ.) তুর পাহাড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন ঘটনাক্রমে সেই পাহাড় আল্লাহ তাআলাকে প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য লাভ করেছিল, কিন্তু মুসা (আ.) আল্লাহকে দেখতে পাননি।

যখন মুসা (আ.) আল্লাহ তাআলাকে দেখার আরজি জানালেন, তখন আল্লাহ তার কাছে ওহি পাঠালেন যে, দুনিয়ার জীবনে তিনি আল্লাহকে দেখতে পাবেন না। আল্লাহ তাকে পাহাড়ের দিকে তাকাতে বললেন যে, পাহাড়টি যদি আল্লাহর সামনে সামনে নিজ স্থানে স্থির থাকে, তবেই তিনি আল্লাহকে দেখতে পাবেন। তারপর আল্লাহ যখন পাহাড়ের ওপর তাঁর তাজাল্লি বা আত্মপ্রকাশ ঘটালেন অর্থাৎ পাহাড়কে স্বীয় সত্তা প্রত্যক্ষ করালেন, তখন আল্লাহর মহিমার ভয়ে ও প্রভাবে পাহাড়টি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। আর এই দৃশ্য দেখে মুসা (আ.) সংজ্ঞাহীন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

হাদিসে বর্ণিত আরেকটি ঘটনায়ও পাথরের অনুভব করার ক্ষমতার কথা এসেছে। নবীজি (সা.) বর্ণনা করেন, পূর্ববর্তী উম্মতের তিন মুসলিম পথিক বিশ্রাম নেওয়ার জন্য পাহাড়ের একটি গুহায় প্রবেশ করেছিলেন। এমন সময় পাহাড়ের চূড়া থেকে একটি বিশাল পাথর খসে পড়ে গুহার মুখ এমনভাবে বন্ধ হয়ে গেল যে, বের হওয়ার সামান্য ফাঁকও অবশিষ্ট রইল না।

তখন তারা একে অপরকে বললেন, আমরা প্রত্যেকেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেছি এমন কোনো নেক আমলের ওসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যাতে আল্লাহ আমাদের এই বিপদ থেকে মুক্তি দেন।

তাদের একজন তার নেক আমলের ওসিলা দিয়ে দোয়া করার সাথে সাথেই গুহার মুখ কিছুটা খুলে গেল, তবে তা বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। দ্বিতীয় জন নিজের নেক আমলের কথা উল্লেখ করে দোয়া করলে গুহার মুখ আরও কিছুটা খুলল, কিন্তু তখনও বের হওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। সর্বশেষ তৃতীয় জন যখন নিজের খাঁটি নেক আমলের ওসিলা ধরে দোয়া করলেন, তখন গুহার মুখ এতখানি খুলে গেল যে তাঁরা নিরাপদে বের হয়ে এলেন।

নবী করিম (সা.) এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছেন, সেই পাথরটি আল্লাহর ভয়েই ওপর থেকে নিচে খসে পড়েছিল।

আল্লাহ তাআলাও পবিত্র কোরআনে বলেছে, অনেক পাথর আল্লাহর ভয়ে ধ্বসে পড়ে। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারায় আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের অন্তরসমূহ এর পরে কঠিন হয়ে গেল যেন তা পাথরের মত কিংবা তার চেয়েও শক্ত। পাথরের মধ্যে কিছু এমন আছে, যা থেকে নদী প্রবাহিত হয়। কিছু এমন আছে যা চূর্ণ হয় ফলে তা থেকে পানি বের হয়। কিছু এমন আছে যা আল্লাহর ভয়ে ধ্বসে পড়ে। আর আল্লাহ তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে গাফেল নন। (সুরা বাকারা: ৭৪)

ইমাম আবু জাফর তাবারি (রহ.) তাঁর তাফসির গ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আল্লাহর ভয় ও প্রভাবে কোনো কোনো পাথর পাহাড়ের চূড়া থেকে গড়িয়ে সমতল ভূমিতে বা পাহাড়ের পাদদেশে খসে পড়ে। আল্লাহ তাআলা পাথরের এই গুণাবলির বর্ণনা দিয়েছেন যে, কিছু পাথর থেকে নদী প্রবাহিত হয়, কিছু বিদীর্ণ হয়ে পানি বের হয় এবং কিছু আল্লাহর ভয়ে নিচে খসে পড়ে।

তাই বনি ইসরাইলের দ্বীনবিমুখ মানুষদের অন্তরকে তিনি পাথরের চেয়ে কঠিন বলেছেন। তারা আল্লাহর নবীগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল এবং প্রকাশ্য অলৌকিক নিদর্শন দেখার পরও আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল। অথচ আল্লাহ তাদের আত্মা ও অন্তর দান করেছিলেন যা তিনি কোনো পাথর বা মাটি-কাদাকে দেননি। তবুও জড় পাথর থেকে নদী প্রবাহিত হয়, বিদীর্ণ হয়ে পানি বের হয়, জড় পাথর আল্লাহর ভয়ে খসে পড়ে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *