আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

আজ ১২ রবিউল আউয়াল। মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও পুণ্যময় একটি দিন—পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। এই দিনটি বিশ্বনবী, সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের স্মৃতির সঙ্গে যেমন জড়িত, তেমনি তাঁর ওফাতের বেদনাবিধুর স্মৃতিও বহন করে।

প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ৫৭০/৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে আরবি বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসে মক্কা নগরীতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন। মা আমিনা বিনতে ওহাবের কোলে জন্ম নেওয়া এই মহামানব শৈশব থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়েতের বার্তাবাহক হিসেবে আবির্ভূত হন।

তাঁর জন্মের সময় আরব সমাজ ছিল অজ্ঞতা, কুসংস্কার, গোত্রীয় সংঘাত, অন্যায়, জুলুম ও নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত। ইতিহাসের ভাষায় সেই সময়কে বলা হয় ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’—অজ্ঞতার যুগ। মানুষের মর্যাদা ছিল ভূলুণ্ঠিত; দুর্বলরা ছিল শক্তিশালীদের অত্যাচারের শিকার। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি ছিল চরম অবিচার। মদ, জুয়া, সুদ, প্রতিশোধ ও গোত্রীয় সংঘাত সমাজজীবনের স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়েছিল।

এমন এক অন্ধকার সময়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) মানবতার জন্য আলোর দিশা নিয়ে আবির্ভূত হন।

সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক

শৈশব থেকেই মহানবী (সা.) ছিলেন অসাধারণ চরিত্রের অধিকারী। তাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও উত্তম আচরণে মক্কার মানুষ এতটাই মুগ্ধ ছিল যে নবুয়ত লাভের আগেই তাঁকে ‘আল-আমিন’—বিশ্বস্ত ও আমানতদার—এবং ‘আস-সাদিক’—সত্যবাদী—উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

তিনি কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেননি, কারও আমানতের খেয়ানত করেননি এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও আল্লাহভীতির অনন্য দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে।

৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ

৪০ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় মহানবী (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। এর মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর নবুয়তি জীবনের। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন এবং শিরক, কুসংস্কার, জুলুম, অন্যায়, বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষাপ থেকে মুক্তির ডাক দেন।

তাঁর আহ্বান ছিল মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আহ্বান। তিনি ঘোষণা করেন—মানুষে মানুষে শ্রেষ্ঠত্ব বংশ, গোত্র, সম্পদ কিংবা ক্ষমতায় নয়; বরং তাকওয়া ও আল্লাহভীতিতে।

মক্কার কাফেররা তাঁর এই সত্যের আহ্বান মেনে নিতে পারেনি। তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদের ওপর চালানো হয় নানা ধরনের নির্যাতন। কিন্তু মহানবী (সা.) ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে ইসলামের বাণী প্রচার করে যেতে থাকেন।

২৩ বছরের নবুয়তি জীবন

প্রায় ২৩ বছর ধরে তিনি ইসলামের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। মক্কার কঠিন সংগ্রামের পর তিনি মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় নয়, বরং ন্যায়, সাম্য, মানবিকতা ও পারস্পরিক সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।

মদিনার সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র ও সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার, পরামর্শ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মর্যাদাকে গুরুত্ব দেন।

তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মদিনার সমাজ পরবর্তীকালে ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করে।

ক্ষমার অনন্য দৃষ্টান্ত

মহানবী (সা.)-এর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ক্ষমাশীলতা। যারা তাঁকে নির্যাতন করেছে, তাঁর সাহাবিদের ওপর অত্যাচার করেছে, তাঁকে মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছে—ক্ষমতার সুযোগ পেয়েও তিনি তাদের অনেককে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর সামনে ছিল সেইসব মানুষ, যারা দীর্ঘদিন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও নির্যাতন চালিয়েছিল। কিন্তু প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ক্ষমা ও মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

এ কারণেই মহানবী (সা.) শুধু মুসলমানদের কাছেই নন, মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৈতিক আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।

নারী, শিশু ও দুর্বলদের অধিকার

মহানবী (সা.) নারী ও শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন। কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে তিনি কঠোর অবস্থান নেন। নারীর মর্যাদা, উত্তরাধিকার, বিবাহে অধিকার এবং পারিবারিক সম্মানের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন।

এতিম, মিসকিন, দরিদ্র, অসহায় ও দুর্বল মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছেন তিনি। প্রতিবেশীর অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, মুসাফিরের অধিকার এবং সমাজের প্রতিটি মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতার শিক্ষা তাঁর জীবন ও বাণীতে সুস্পষ্ট।

মানবতার প্রতি তাঁর শিক্ষা

মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল মানবকল্যাণের জন্য নিবেদিত। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন—অন্যের প্রতি দয়া করতে, সত্য কথা বলতে, আমানত রক্ষা করতে, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করতে, প্রতিবেশীর হক আদায় করতে এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকতে।

তিনি প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমা, বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা, বিভেদের পরিবর্তে ভ্রাতৃত্ব এবং অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায় প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন।

তাঁর বিদায় হজের ভাষণ মানবাধিকারের ইতিহাসেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব এবং অন্যায়-জুলুম থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

কোরআনের আলোকে মহানবী (সা.)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা মহানবী (সা.)-এর চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” (সূরা আল-কলম: ৪)

আর অন্যত্র তাঁকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)

তাই মহানবী (সা.)-এর জীবন কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় বা জাতির জন্য নয়; তাঁর আদর্শ সমগ্র মানবজাতির জন্য পথনির্দেশনা।

ওফাতের বেদনাবিধুর স্মৃতি

৬৩ বছর বয়সে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় ইন্তেকাল করেন। প্রচলিত ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, তাঁর ওফাতও রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে সংঘটিত হয়।

তাঁর ইন্তেকালে সাহাবায়ে কেরাম গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। যে মহান মানুষটি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানবতার মুক্তির জন্য, তাঁর দুনিয়া থেকে বিদায় মুসলিম উম্মাহর জন্য ছিল অপূরণীয় ক্ষতি।

তবে তাঁর রেখে যাওয়া কোরআন ও সুন্নাহ আজও কোটি কোটি মানুষের জীবনের পথপ্রদর্শক।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *