আইসিইউর সেই হাতকড়া আর খোলা হলো না, চিরবিদায় নিলেন মনির খান

রাসেল মোল্লা: কয়েক সপ্তাহ আগে একটি ছবি থমকে দিয়েছিল অসংখ্য মানুষকে। হাসপাতালের সাদা বিছানায় নিশ্চল এক মানুষ। গলায় শ্বাসনালির মোটা পাইপ, নাকে অক্সিজেনের নল, আঙুলে অক্সিমিটার।

শরীরের প্রতিটি স্পন্দন তখন মাপছিল যন্ত্র। শুধু একটি জিনিস যেন সেই চিকিৎসার ভাষাকেও অতিক্রম করেছিল। ডান হাতে ঝুলছিল একটি হাতকড়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবির মানুষটি ছিলেন পটুয়াখালীর মিজানুর রহমান, যিনি মনির খান নামেই পরিচিত।

আইসিইউর শয্যায় শুয়ে থাকা একজন সংজ্ঞাহীন মানুষের হাতে হাতকড়া কেন, সেই প্রশ্নে উত্তাল হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু প্রশ্নের চেয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিল সময়।

বুধবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মনির খান। বয়স হয়েছিল ৪৮ বছর।

গত ১৪ জুন তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। দুদিন পরই তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

পরিবারের দাবি, এরপর আর তাঁর জ্ঞান ফেরেনি। জীবন তখন আর ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, হিসাব হচ্ছিল মনিটরের সবুজ রেখায়, ভেন্টিলেটরের শব্দে আর চিকিৎসকদের নীরব পর্যবেক্ষণে।

মনির খানের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল হাসপাতালের বিছানায় নয়, কারাগারের ভেতরে। গত ৯ জুন কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল, তারপর আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ। সেই পথের শেষ গন্তব্য আর বাড়ি হয়ে ওঠেনি।

জুলাইয়ের শেষ দিকে আইসিইউর বাইরে বসে ছেলেকে নিয়ে কথা বলছিলেন তাঁর মা মাতোয়ারা বেগম। চোখের সামনে ছেলের শরীর, কিন্তু ছেলের সঙ্গে আর কোনো কথোপকথন নেই।

তিনি বলেছিলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর দুই দিন খালি ‘ও-মা’ বলে ডাকছে। তারপর তো ছেলের দিনদুনিয়ার আর কোনো খেয়ালই নাই। মাকেও চেনে না। সম্পূর্ণ শরীরই তো প্যারালাইজড।

মায়ের সেই অপেক্ষা আর পূরণ হলো না।

মনিরের স্ত্রী সালমা জাহানও একসময় কারাবন্দী ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও প্রায় এক মাস তাঁর স্বামীর হাতে হাতকড়া ছিল।

পরিবারের অনুরোধে চিকিৎসকেরা যখন জানান, রোগীর অবস্থা আর ফিরিয়ে আনা কঠিন, তখন দায়িত্বে থাকা পুলিশ হাতকড়া খুলে দেয়। কিন্তু তত দিনে হাতের শিকল খুললেও শরীরের ভেতরে মৃত্যুর যে অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়েছিল, তা আর ছিন্ন হয়নি।

আইসিইউর ছবিটি কীভাবে বাইরে এলো, সেই উত্তর আজও মেলেনি। তবে ছবিটি থেকে গেছে। একটি সময়ের সাক্ষী হয়ে।

এমন এক সময়ের, যেখানে জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আইন, আর সেই দুইয়ের মাঝখানে নিঃশব্দে পড়ে ছিল এক মানুষের শরীর।

মনির খান ছিলেন পটুয়াখালী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পটুয়াখালী জেলা কমিটির সদস্য। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে ঢাকায় একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে ঢাকাসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। প্রায় ১১ মাস কারাগারে ছিলেন তিনি। বিভিন্ন মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় তাঁকে কারাগারেই থাকতে হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আদালতের তারিখ, মামলার নথি কিংবা হাসপাতালের চিকিৎসা, কোনো কিছুই তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।

শুধু রয়ে গেল একটি ছবি। যে ছবিতে এক হাতে ছিল অক্সিমিটার, আর সেই হাতেই ছিল হাতকড়া।

এখন সেই হাতকড়ার আর কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, যে হাতকে বেঁধে রাখা হয়েছিল, সে হাত আজ সব বন্ধন পেরিয়ে নিথর।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *