সম্পাদকীয়ঃ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। বিশ্বমানবতার জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্মৃতি আজ মুসলিম উম্মাহ গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে স্মরণ করছে। তাঁর জীবন ছিল সত্য, ন্যায়, মানবতা, ক্ষমা, সহনশীলতা ও উত্তম চরিত্রের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—মহানবী (সা.)-কে আমরা কতটা ভালোবাসি, আর তাঁর শিক্ষা আমাদের জীবনে কতটা প্রতিফলিত হয়?
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়; এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন। তাঁর জন্মের স্মৃতি উদযাপনের পাশাপাশি তাঁর জীবনাদর্শ আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিও ভাবার সময়।
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তি ও সভ্যতার অগ্রগতিতে অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু মানুষের নৈতিক ও মানবিক সংকট যেন দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ, মিথ্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি, অন্যায়, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা নানা রূপে বিস্তার লাভ করছে। স্বার্থের কাছে নীতি পরাজিত হচ্ছে, ক্ষমতার কাছে ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, অর্থের কাছে মানবিকতা অনেক সময় মূল্যহীন হয়ে পড়ছে।
এমন বাস্তবতায় মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
তিনি শিখিয়েছেন সত্য কথা বলতে, আমানত রক্ষা করতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। তিনি শিখিয়েছেন দুর্বলকে সাহায্য করতে, এতিমের প্রতি সদয় হতে, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করতে এবং মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করতে। তিনি প্রতিশোধের সুযোগ পেয়েও ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শত্রুর প্রতিও ন্যায়বিচার করেছেন। নিজের জন্য নয়, মানুষের কল্যাণের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।
আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই আদর্শের বাস্তব প্রয়োগ।
আমরা যদি মহানবী (সা.)-কে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসি, তাহলে সেই ভালোবাসা শুধু মুখের প্রশংসা, স্লোগান কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাঁর দেখানো পথে চলা। তাঁর সুন্নাহকে জীবনের অংশ করা। তাঁর চরিত্রের আলোয় নিজের চরিত্রকে গড়ে তোলা।
একজন ব্যবসায়ী যদি সততা ও আমানতদারির সঙ্গে ব্যবসা করেন, একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষ ও দুর্নীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখেন, একজন রাজনীতিক যদি ক্ষমতাকে মানুষের সেবার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন, একজন শিক্ষক যদি নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে দেন, একজন সন্তান যদি বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণ করেন এবং একজন প্রতিবেশী যদি অন্য প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করেন—তবেই মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা সমাজে বাস্তব রূপ পাবে।
কারণ ইসলাম শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; ইসলাম মানুষের চরিত্র সুন্দর করার শিক্ষা দেয়। নামাজ, রোজা, জাকাত ও অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, ন্যায়বিচার, দয়া, ক্ষমা, সত্যবাদিতা ও মানবিকতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আজ আমাদের সমাজে ধর্মীয় পরিচয় আছে, কিন্তু সেই পরিচয়ের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর চরিত্র কতটা যুক্ত—সেটিই হওয়া উচিত আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার বিষয়।
আমরা যদি নামাজ পড়ি, কিন্তু মানুষের হক নষ্ট করি; রোজা রাখি, কিন্তু মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে বিরত না থাকি; মহানবী (সা.)-এর প্রশংসা করি, কিন্তু তাঁর ক্ষমাশীলতা ও সহনশীলতা অনুসরণ না করি—তাহলে আমাদের ভালোবাসা ও আনুগত্যের দাবি কতটা সত্য, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।
আজকের দিনে মহানবী (সা.)-এর অন্যতম বড় শিক্ষা হতে পারে—ভিন্নমতকে সম্মান করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা। মতের অমিল শত্রুতায় পরিণত না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
একটি সুন্দর সমাজ কেবল আইন দিয়ে তৈরি হয় না; সুন্দর সমাজ গড়তে প্রয়োজন সুন্দর চরিত্রের মানুষ। আর চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.)-এর জীবন মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।
তাই এবারের ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এ আমাদের অঙ্গীকার হোক—শুধু তাঁকে স্মরণ নয়, তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করব। শুধু তাঁর প্রতি ভালোবাসার কথা বলব না, তাঁর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। আমাদের ঘর থেকে শুরু হোক পরিবর্তন; পরিবার থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ুক সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও শান্তির বার্তা।
মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা যদি আমাদের জীবনের শিক্ষা হয়ে ওঠে, তাহলে ব্যক্তিজীবনে আসবে নৈতিকতার সৌন্দর্য, পরিবারে আসবে শান্তি, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায় ও মানবিকতা এবং রাষ্ট্রে শক্তিশালী হবে ইনসাফ ও কল্যাণের ভিত্তি।
এই পবিত্র দিনে তাই আমাদের প্রার্থনা—মহান আল্লাহ যেন আমাদের অন্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা সৃষ্টি করেন, তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করেন এবং তাঁর মহান চরিত্রের আলোয় নিজেদের জীবন, পরিবার ও সমাজকে আলোকিত করার শক্তি দেন।
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ।
মিলাদুন্নবীর শিক্ষা হোক জীবনের শিক্ষা—মহানবী (সা.)-এর আদর্শ হোক আমাদের চরিত্র, আমাদের পথচলা ও আমাদের সমাজ নির্মাণের প্রেরণা।
মোহাম্মাদ নুরুজ্জামান
প্রকাশক ও চেয়ারম্যান।




